বন্ধুরা, কেমন আছেন সবাই? আজ কথা বলবো আমাদের প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে, বিশেষ করে তাদের প্রাথমিক শিক্ষায় কী কী পরিবর্তন আসছে আর সেখানকার শিশুরা কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হচ্ছে!

আমরা প্রায়ই ভাবি, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে আমাদের শিশুদের কীভাবে প্রস্তুত করা উচিত, তাই না? থাইল্যান্ডেও কিন্তু ঠিক এই একই আলোচনা চলছে। একসময় থাইল্যান্ড শিক্ষায় অনেক এগিয়ে ছিল, স্কুলে যাওয়া শিশুর সংখ্যাও বেড়েছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার মান নিয়ে কিছু বড়সড় প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট আর পুরনো সিলেবাসের কারণে বাচ্চারা পিছিয়ে পড়ছে।ভাবুন তো, একটা শিশু স্কুলে গিয়ে যদি শুধু মুখস্থ বিদ্যা শেখে, বাস্তব জীবনে তার কোনো কাজে না লাগে, তাহলে কেমন লাগবে?
থাইল্যান্ডেও এখন ঠিক এমন সমস্যা দেখা যাচ্ছে, যেখানে অনেক পড়াশোনার পরেও ছাত্রছাত্রীরা আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় ভালো করতে পারছে না। তাই এখন সেখানে নতুন করে কারিকুলাম বদলানো হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনা নয়, বরং বিশ্লেষণাত্মক আর সৃজনশীল চিন্তাভাবনা শিখতে পারে। এমনকি সরকার “জিরো ড্রপআউট” প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে, যাতে কোনো শিশুই স্কুল থেকে ঝরে না পড়ে। এই পরিবর্তনগুলো কতটা কাজে দেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। চলুন, নিচে আমরা থাইল্যান্ডের এই শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জেনে নিই।
থাইল্যান্ডের শিক্ষার নতুন দিগন্ত: কেমন হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো?
থাইল্যান্ডের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এখন এক নতুন পথে হাঁটছে। আমরা যেমন আমাদের শিশুদের জন্য নতুন নতুন শিক্ষার পদ্ধতি খুঁজি, থাইল্যান্ডও ঠিক তাই করছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো মুখস্থ-নির্ভর পড়াশোনার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে তারা এখন এমন একটি কারিকুলাম নিয়ে কাজ করছে, যা শিশুদের বাস্তব জীবনের জন্য আরও বেশি প্রস্তুত করবে। ভাবুন তো, আপনার সন্তান যদি শুধু বইয়ের পাতা থেকে শেখে আর সেই জ্ঞান যদি কোনো সমস্যা সমাধানে কাজে না আসে, তাহলে কেমন হবে?
থাইল্যান্ডের শিক্ষাবিদরা ঠিক এই সমস্যাটাই উপলব্ধি করেছেন। পিআইএসএ (PISA) পরীক্ষায় থাই শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলাফল এই নতুন পরিবর্তনের মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থীকে “কার্যত নিরক্ষর” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যাদের প্রাথমিক স্তরের বাইরে পড়ার দক্ষতা নেই। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে তারা এখন দক্ষতা-ভিত্তিক (competency-based) শিক্ষায় জোর দিচ্ছে, যেখানে শিশুরা শুধু তথ্য শিখবে না, বরং সেই তথ্য বিশ্লেষণ করতে এবং নতুন কিছু তৈরি করতে শিখবে। আমার মনে হয়, এই পরিবর্তনটা খুবই দরকারি, কারণ আজকের দিনে শুধু ডিগ্রি থাকলেই হয় না, দরকার পড়ে কাজের দক্ষতা আর সৃজনশীলতা। এই নতুন কারিকুলামে ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক অধ্যয়ন, স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা, শিল্পকলা, প্রযুক্তি এবং বিদেশী ভাষার মতো আটটি মূল বিষয় থাকবে, তবে সেগুলো শেখানো হবে আরও সমন্বিত উপায়ে, যেখানে শিক্ষকরা কোচের মতো কাজ করবেন এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় শিক্ষণে উৎসাহিত করবেন।
সক্ষমতা-ভিত্তিক কারিকুলামের উদ্ভাবন
থাইল্যান্ডের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি একটি ‘সক্ষমতা-ভিত্তিক কারিকুলাম’ প্রবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা প্রিস্কুল (৩-৬ বছর) এবং প্রাথমিক ১-৩ (৬-৯ বছর) স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এই কারিকুলামের মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের মধ্যে পড়া, লেখা, গণিত এবং অন্যান্য মৌলিক দক্ষতা গড়ে তোলা, যা তাদের আজীবন শিখতে এবং নিজেদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সাহায্য করবে। আগে যেখানে শিক্ষার্থীরা আটটি মূল বিষয় আলাদা আলাদাভাবে শিখতো, এখন সেগুলোকে একত্রিত করে মৌলিক দক্ষতার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যখন শিশুরা বিভিন্ন বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে না শিখে একটার সঙ্গে অন্যটার যোগসূত্র খুঁজে পায়, তখন তাদের শেখাটা আরও গভীর হয়। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও এখন আর জিপিএ (GPA) সিস্টেম থাকছে না, বরং পড়া, লেখা ও গণিত দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হবে, যা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সক্ষমতাকে তুলে ধরতে সাহায্য করবে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা যদিও এই দ্রুত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি প্রকাশ করেছেন, কারণ সাধারণত কারিকুলাম পরিবর্তনের জন্য কয়েক বছর আগে থেকে পরিকল্পনা করা হয়, তবে মন্ত্রণালয় আশা করছে এটি থাইল্যান্ডের শিক্ষার মান উন্নয়নে একটি মাইলফলক হবে। এই ধরনের উদ্যোগ শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য সত্যিই এক দারুণ প্রস্তুতি দেবে।
শিক্ষকদের জন্য নতুন ভূমিকা
নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ভূমিকা হবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আর শুধু তথ্য প্রদানকারী হিসেবে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের গাইড বা কোচ হিসেবে কাজ করতে হবে, যারা শিশুদের সক্রিয় শিক্ষণে উৎসাহিত করবেন। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকরা যাতে তাদের কাজ সহজে করতে পারেন, সেজন্য তাদের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ এবং এআই (AI) টুলস ব্যবহার করে ক্লাস পরিকল্পনা তৈরি ও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আমি যখন নিজে শিক্ষকতা করতাম, তখন দেখেছি, শ্রেণীকক্ষে শুধু লেকচার দিলে শিক্ষার্থীরা তেমন আগ্রহী হয় না। যখন তাদের নিজেদের হাতে-কলমে কিছু করার সুযোগ দেওয়া হয়, তখন তারা আরও বেশি শেখে। থাইল্যান্ডও এখন ঠিক এই পদ্ধতিতেই এগোচ্ছে। তবে শিক্ষক সংকট এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। যোগ্য শিক্ষক এবং শিক্ষকের সংখ্যা উভয় দিক থেকেই ঘাটতি রয়েছে, যা শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের কথা ভাবছে, কারণ একজন ভালো শিক্ষক হাজারো ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারেন। শিক্ষকদের কাজের চাপ কমানো এবং তাদের কল্যাণের দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।
ঝরে পড়া রোধে “থাইল্যান্ড জিরো ড্রপআউট” কর্মসূচি
শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি থাইল্যান্ড সরকার শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধেও বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। প্রায় ১০ লাখ থাই তরুণ-তরুণী, যাদের বয়স ৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে, বিভিন্ন কারণে স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার “থাইল্যান্ড জিরো ড্রপআউট” (Thailand Zero Dropout) কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে জাতীয় এজেন্ডার অংশ হিসেবে এই সমস্যা মোকাবেলার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার মনে হয়, শুধু পড়াশোনার মান বাড়ালেই হবে না, সব শিশুর স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষার অধিকার সবারই আছে, আর কোনো শিশু যেন পরিস্থিতির শিকার হয়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটা আমাদের নিশ্চিত করা উচিত। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ঝরে পড়া শিশুদের চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং তাদের জন্য বিকল্প শিক্ষার পথ ও সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা আবার মূল শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে আসতে পারে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, প্রতিটি শিশু যেন তাদের নিজস্ব সম্ভাবনা অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং কেউ যেন পেছনে পড়ে না থাকে।
ঝরে পড়ার কারণ এবং সমাধান
শিক্ষার্থীরা কেন স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, তার পেছনে অনেক কারণ থাকে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পরিবারের স্থান পরিবর্তন, স্কুল থেকে দূরে বসবাস, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, মাদকাসক্তি এবং অক্ষমতা – এগুলোর সবই ঝরে পড়ার কারণ হতে পারে। “থাইল্যান্ড জিরো ড্রপআউট” কর্মসূচির আওতায় এই কারণগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। আমার পরিচিত এক পরিবার ছিল, যেখানে বাবার চাকরি চলে যাওয়ায় মেয়েটার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমন ঘটনা আমাদের আশেপাশেও অহরহ ঘটে। থাইল্যান্ড সরকার এই সমস্যাগুলোকে গুরুত্বের সাথে দেখছে। তারা শুধু ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নয়, যারা এখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি, তাদেরও চিহ্নিত করছে। এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ডেটা একত্রিত করা, যাতে স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়। এছাড়া, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকেও উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে এবং পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
সমন্বিত তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার
“থাইল্যান্ড জিরো ড্রপআউট” কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত তথ্য প্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস এবং “থাই জিরো ড্রপআউট অ্যাপ্লিকেশন” (TZD App) অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা শিক্ষার্থীদের ড্রপআউট হওয়া পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে সাহায্য করবে। ভাবুন তো, প্রযুক্তির মাধ্যমে যদি প্রতিটি শিশুর গতিবিধি অনুসরণ করা যায়, তাহলে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া কত সহজ হবে। এই অ্যাপ্লিকেশন এবং ডেটাবেস শিক্ষাবিদ ও নীতি নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করবে, যা তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সাহায্য করবে। Equitable Education Fund (EEF) এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, কারণ তাদের লক্ষ্য হলো মানসম্মত শিক্ষা সবার জন্য নিশ্চিত করা। আমার মনে হয়, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সত্যিই শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব আনতে পারে এবং থাইল্যান্ড এই পথেই এগোচ্ছে।
শিক্ষক সংকট ও গ্রামীণ স্কুলের চ্যালেঞ্জ
থাইল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক সংকট একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলোতে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের প্রায় ৬৪% প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে, যার অর্থ প্রতি শ্রেণীকক্ষে গড়ে একজন শিক্ষকেরও কম। এর ফলে একজন শিক্ষককে অনেকগুলো বিষয় বা শ্রেণী পড়াতে হয়, যা শিক্ষার মানকে খারাপভাবে প্রভাবিত করে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, যখন একজন শিক্ষককে অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়, তখন সব শিক্ষার্থীর প্রতি সমান মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শহরাঞ্চলের স্কুলগুলোতে যেখানে উন্নত অবকাঠামো এবং যোগ্য শিক্ষক থাকে, সেখানে গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলো প্রায়ই প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং অবকাঠামোর অভাবে ভোগে। এছাড়াও, গ্রামীণ এলাকায় তুলনামূলকভাবে কম যোগ্য এবং কম অভিজ্ঞ শিক্ষক পাঠানো হয়, যা এই বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই সমস্যাগুলো থাই শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের, আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলের অন্যতম কারণ।
শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
শিক্ষক সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। থাইল্যান্ডের শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের কাজের চাপ কমানোর এবং তাদের কল্যাণের উন্নতির দিকেও নজর দিচ্ছে। কারণ একজন শিক্ষক যদি মানসিকভাবে সুস্থ ও অনুপ্রাণিত থাকেন, তবেই তিনি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারবেন। নতুন কারিকুলামের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে, যেখানে তাদের নতুন শিক্ষণ কৌশল এবং এআই টুলস ব্যবহারে পারদর্শী করে তোলা হবে। আমার বিশ্বাস, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিলে এবং তাদের কাজের পরিবেশ উন্নত করলে, তারা আরও বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সরকার শিক্ষক নেতাদের (school director) দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের কথাও ভাবছে, কারণ একজন দক্ষ নেতা একটি পুরো স্কুলের মান পরিবর্তন করতে পারেন।
শিক্ষার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ
থাইল্যান্ডের শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের মোট বাজেটের প্রায় ১০% শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ করে, যা OECD গড় থেকে কম। এই সীমিত বাজেটও শিক্ষার মান উন্নয়নে একটি বাধা হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হলে শুধু কারিকুলাম পরিবর্তন করলেই হবে না, পর্যাপ্ত আর্থিক বিনিয়োগও অপরিহার্য। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (STEM) শিক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন, কারণ এই বিষয়গুলো আধুনিক বিশ্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, শিক্ষার প্রতিটি ধাপে যদি পর্যাপ্ত বিনিয়োগ থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা উন্নত ল্যাব সুবিধা পাবে, আধুনিক শিক্ষণ উপকরণ ব্যবহার করতে পারবে এবং দক্ষ শিক্ষকদের কাছ থেকে শিখতে পারবে। থাইল্যান্ড সরকার এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, যা বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে। পিতামাতা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণও শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, কারণ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয় সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।
প্রযুক্তি এবং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়
বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ছাড়া শিক্ষা অসম্পূর্ণ। থাইল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থাও এই সত্যটা উপলব্ধি করে প্রযুক্তির সাথে আধুনিক শিক্ষাকে একত্রিত করার চেষ্টা করছে। ক্লাসরুমে ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার থেকে শুরু করে অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম তৈরি পর্যন্ত নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য যেখানে মানসম্মত শিক্ষকের অভাব রয়েছে, সেখানে অনলাইন রিসোর্স এবং এআই (AI) টুলস ব্যবহার করে শেখার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। আমার দেখা এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক জটিল বিষয় সহজে শিখেছে। থাইল্যান্ডে শিক্ষকদের এআই টুলস ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা আরও কার্যকরভাবে সিলেবাস তৈরি করতে এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে পারেন। এটা শিক্ষার্থীদের জন্য শেখার প্রক্রিয়াকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে, আর শিক্ষকদের জন্য কাজের চাপ কমাবে।
ডিজিটাল সাক্ষরতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি
ডিজিটাল সাক্ষরতা আজকের দিনে খুবই জরুরি। থাইল্যান্ড সরকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। OECD Skills Strategy Thailand রিপোর্ট অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের মাত্র ১% জনসংখ্যার উন্নত ডিজিটাল দক্ষতা রয়েছে। এই চিত্র পরিবর্তন করতে ডিজিটাল কাউন্সিল অফ থাইল্যান্ডের লক্ষ্য হলো, চলতি বছরের মধ্যে ৭০% ডিজিটাল সাক্ষরতা অর্জন করা। এর মানে হলো, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহার, কোডিং, এবং সাইবার সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো শেখানো হবে। আমার বিশ্বাস, এই দক্ষতাগুলো তাদের ভবিষ্যতের কর্মজীবনে অনেক সাহায্য করবে। কারণ আগামী দিনে সব কাজই কোনো না কোনোভাবে প্রযুক্তির সাথে জড়িত থাকবে। শিক্ষা ব্যবস্থার এই ডিজিটাল রূপান্তর থাইল্যান্ডকে একটি জ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিণত করতে সাহায্য করবে।
সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশ
থাইল্যান্ডের পুরোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থ বিদ্যার ওপর বেশি জোর দেওয়া হতো, যেখানে সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার তেমন সুযোগ ছিল না। নতুন কারিকুলামে এই সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে শেখানো হবে, যাতে তারা কোনো কিছু মুখস্থ না করে বরং বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে, নতুন ধারণা তৈরি করতে এবং সমস্যা সমাধান করতে শেখে। আমার মতে, শিশুদের মধ্যে এই গুণগুলো ছোটবেলা থেকেই তৈরি হওয়া উচিত। কারণ যারা প্রশ্ন করতে শেখে, তারাই নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারে। থাইল্যান্ডের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন শিক্ষকদের এমন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যাতে তারা সক্রিয় শিক্ষণ পদ্ধতি (active learning) ব্যবহার করেন এবং শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে উৎসাহিত করেন। এটি শুধু পড়াশোনার মানই বাড়াবে না, বরং থাই শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রস্তুত করবে।
শিক্ষার গুণগত মান এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা
থাইল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে পিছিয়ে আছে। পিআইএসএ (PISA) পরীক্ষায় থাই শিক্ষার্থীরা গণিত, বিজ্ঞান এবং পঠন দক্ষতার দিক থেকে OECD গড় থেকে নিচে অবস্থান করছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের তুলনায়ও তাদের ফলাফল খারাপ। এই সমস্যা থাইল্যান্ডের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে মানসম্মত শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। আমার মনে হয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু শিক্ষার পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, বরং এর গুণগত মানও নিশ্চিত করতে হবে। থাইল্যান্ড সরকার এখন তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানের সাথে সঙ্গতি বিধান
থাইল্যান্ড তাদের কারিকুলামকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কাজ করছে। এতে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি, ইংরেজি ভাষার দক্ষতার উন্নতিও একটি প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে থাইল্যান্ড EF English Proficiency Index-এ ১১২টি দেশের মধ্যে ১০৬ নম্বরে আছে, যা খুবই হতাশাজনক। ইংরেজি হলো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ব্যবসা এবং পর্যটনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষা। আমার মতে, ছোটবেলা থেকেই যদি শিক্ষার্থীদের কার্যকর ইংরেজি শেখানো যায়, তাহলে তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে থাকবে। সরকার শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি উন্নত করছে এবং শিক্ষণ পদ্ধতিকে আধুনিক করার চেষ্টা করছে, যা শিক্ষার সামগ্রিক মানকে উন্নত করবে।
শিক্ষা সংস্কারে সমাজের অংশগ্রহণ
শিক্ষা সংস্কার শুধু সরকারের একার কাজ নয়, এতে সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি। থাইল্যান্ডের শিক্ষামন্ত্রী নারুমোন বলেছেন যে, সংস্কারের ক্ষেত্রে সমাজের সব অংশের মানুষকে জড়িত করতে হবে। পিতামাতা, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং বেসরকারি খাতকে শিক্ষার প্রক্রিয়ায় আরও বেশি করে সংযুক্ত করার চেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থীদের মনোভাব গঠনে পিতামাতার ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, যখন একটি শিশু তার পরিবার এবং স্কুলের কাছ থেকে সমান সমর্থন পায়, তখন সে আরও ভালো ফল করে। থাইল্যান্ডে কিছু শিক্ষার্থী সংগঠন, যেমন “ব্যাড স্টুডেন্ট গ্রুপ” (Bad Student Group), শিক্ষার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনও করেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে পরিবর্তনের চাহিদা সমাজের মধ্যে কতটা তীব্র। এই ধরনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
| শিক্ষার স্তর | বয়সসীমা | মূল বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| প্রিস্কুল শিক্ষা | ৩-৬ বছর | বাধ্যতামূলক নয়, শারীরিক, মানসিক, আবেগিক ও সামাজিক বিকাশে সহায়তা। |
| প্রাথমিক শিক্ষা | ৬-১২ বছর (প্রথোম ১-৬) | বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে, পড়া, লেখা, গণিত এবং মৌলিক দক্ষতা বিকাশে জোর। |
| নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা | ১২-১৫ বছর (মাথায়োম ১-৩) | বাধ্যতামূলক, উচ্চতর শিক্ষার ভিত্তি তৈরি। |
| উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা | ১৫-১৮ বছর (মাথায়োম ৪-৬) | বাধ্যতামূলক নয়, সাধারণ ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ট্র্যাক। |
ভবিষ্যতের জন্য থাই শিশুদের প্রস্তুতি
থাইল্যান্ড এখন তাদের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে চাইছে, যেখানে তারা শুধুমাত্র ডিগ্রিধারী হবে না, বরং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে সক্ষম হবে। ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, যেমন বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা, এবং সমালোচনামূলক দক্ষতা বিকাশে জোর দেওয়া হচ্ছে। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন শুধু মুখস্থ করে পাশ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু এখন সময় বদলেছে, আর এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো উচিত। থাইল্যান্ডের নতুন শিক্ষামন্ত্রী শিশুদের মধ্যে থাই ইতিহাস এবং নাগরিক শিক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে তারা তাদের সংস্কৃতি ও গণতন্ত্র সম্পর্কে সচেতন হয়। এটি তাদের দেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করবে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
কর্মজীবনের জন্য দক্ষতা তৈরি
থাইল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, শিক্ষার্থীদের আধুনিক কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা। অনেক নিয়োগকর্তা অভিযোগ করেন যে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার অভাব রয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে (TVET) জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে। “লার্ন টু আর্ন” (Learn to Earn) মডেলের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের সুযোগও তৈরি করা হচ্ছে, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করবে। আমার মনে হয়, এই ধরনের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং তাদের কর্মজীবনের জন্য আরও বেশি প্রস্তুত করবে।
অবিচ্ছিন্ন শেখার সংস্কৃতি

থাইল্যান্ডে এখন অবিচ্ছিন্ন শেখার (lifelong learning) একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। শিক্ষা শুধু স্কুল বা কলেজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মানুষ যেন সারা জীবন নতুন কিছু শিখতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। অ-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থাও (non-formal education) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী নমনীয় শিক্ষার সুযোগ দেয়। এই সিস্টেমে যারা ঐতিহ্যবাহী স্কুলে পিছিয়ে পড়েছে, তারা তাদের গতিতে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে পারে, এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও সাধারণ ও বৃত্তিমূলক প্রোগ্রাম রয়েছে। আমার বিশ্বাস, এমন একটি ব্যবস্থা থাকলে যেকোনো বয়সের মানুষ তার শেখার আগ্রহকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে এবং সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আরও উন্নত করতে পারবে। থাইল্যান্ড এই পথে এগিয়ে গিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।
লেখা শেষ করছি
বন্ধুরা, থাইল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় যে বিশাল পরিবর্তনগুলো আসছে, সেগুলো জেনে কেমন লাগলো? আমার তো মনে হয়, যেকোনো দেশের ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার মান উন্নয়ন করাটা খুবই জরুরি। বিশেষ করে, প্রাথমিক স্তরে শিশুদের যদি সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে তারা জীবনের সব ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে যেতে পারবে। থাইল্যান্ড সরকার যেভাবে সক্ষমতা-ভিত্তিক শিক্ষায় জোর দিচ্ছে এবং ঝরে পড়া রোধে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। আশা করি, এই পরিবর্তনগুলো থাই শিশুদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য
১. আপনার শিশুর মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা বিকাশে উৎসাহিত করুন, শুধু মুখস্থ করার উপর জোর দেবেন না।
২. প্রযুক্তির ব্যবহারকে শিক্ষার একটি অংশ হিসেবে দেখুন এবং শিশুদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিন, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
৩. ইংরেজি ভাষা শেখার গুরুত্বকে অবহেলা করবেন না; এটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং উচ্চশিক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।
৪. পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশেও সমান গুরুত্ব দিন, কারণ বর্তমান কর্মজীবনে শুধু ডিগ্রি নয়, কাজের দক্ষতাও অত্যন্ত জরুরি।
৫. শিশুদের মধ্যে আজীবন শেখার (lifelong learning) আগ্রহ তৈরি করুন, কারণ সময়ের সাথে সাথে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূল বিষয়গুলি এক নজরে
থাইল্যান্ড বর্তমানে তাদের পুরোনো মুখস্থ-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ২১ শতকের উপযোগী এক নতুন দিগন্তে পা বাড়াচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষায় যে আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তার মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের মধ্যে শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়, বরং বিশ্লেষণাত্মক, সৃজনশীল এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটানো। পিআইএসএ (PISA) পরীক্ষায় থাই শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকার কারণে এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে। সক্ষমতা-ভিত্তিক কারিকুলাম প্রবর্তনের মাধ্যমে শিশুরা বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে আরও বেশি পারদর্শী হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষকরা এখন আর শুধু তথ্য প্রদানকারী হিসেবে থাকবেন না, বরং তারা হবেন গাইড বা কোচ, যারা শিক্ষার্থীদের সক্রিয় শিক্ষণে উৎসাহিত করবেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এমন পরিবর্তন প্রতিটি শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে দারুণ সহায়ক হবে।
পাশাপাশি, “থাইল্যান্ড জিরো ড্রপআউট” কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে আবার শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পরিবারের স্থান পরিবর্তন, এবং অন্যান্য সামাজিক কারণগুলো চিহ্নিত করে তাদের জন্য বিকল্প শিক্ষার পথ ও সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার, যেমন “থাই জিরো ড্রপআউট অ্যাপ্লিকেশন” (TZD App), এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা শিক্ষার্থীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে সাহায্য করবে। তবে শিক্ষক সংকট, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়, এবং সীমিত বাজেট এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য। শিক্ষার এই সামগ্রিক সংস্কার থাইল্যান্ডের শিশুদের একটি উজ্জ্বল এবং প্রতিযোগিতামূলক ভবিষ্যৎ উপহার দেবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: থাইল্যান্ড কেন তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন বড়সড় পরিবর্তন আনছে?
উ: আরে ভাই, এটাই তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন! আমরা তো সবাই জানি, শিক্ষার মান ভালো না হলে একটা জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে। থাইল্যান্ডেও একসময় শিক্ষা দারুণ ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমার নিজেরও মনে হয়, শুধু বই পড়ে মুখস্থ করে পরীক্ষা পাস করলে কি আর জীবনের জন্য তৈরি হওয়া যায়?
থাইল্যান্ডের সরকারও ঠিক একই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। বিশেষ করে গ্রামের দিকের স্কুলগুলোতে ভালো শিক্ষকের অভাব, অনেক পুরোনো দিনের সিলেবাস, আর বাচ্চাদের মধ্যে পড়ালেখার উৎসাহ কমে যাওয়া—এসব মিলিয়ে একটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরীক্ষাগুলোতে তাদের ছাত্রছাত্রীরা তেমন ভালো ফল দেখাতে পারছিল না। তাই সরকার দেখছে, যদি এখনই কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ আসলেই অন্ধকার। তারা চায় না তাদের শিশুরা শুধু মুখস্থ বিদ্যা নিয়ে বড় হোক, বরং তারা যেন বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারে এমন দক্ষতা নিয়ে বেড়ে ওঠে। এই কারণেই এত বড় পরিবর্তন আনার দরকার পড়েছে।
প্র: থাইল্যান্ডের প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন কী ধরনের পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন আনা হচ্ছে?
উ: হ্যাঁ, এটা একটা দারুণ দিক! আমি নিজে যখন ছোট ছিলাম, তখন শুধু মুখস্থ বিদ্যাতেই জোর দেওয়া হতো, যেটা অনেক সময় একঘেয়ে লাগত। থাইল্যান্ডও এই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে এবং দারুণ একটা উদ্যোগ নিয়েছে। এখন তারা এমন একটা নতুন কারিকুলাম নিয়ে আসছে যেখানে বাচ্চারা শুধু বইয়ের পোকা হবে না, বরং বিশ্লেষণাত্মক আর সৃজনশীল চিন্তাভাবনা শিখবে। ভাবুন তো, একটা শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা নিয়ে বড় হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তার কত সুবিধা হবে!
এর মানে হলো, তারা শুধুমাত্র তথ্য মুখস্থ করার পরিবর্তে, কীভাবে তথ্য ব্যবহার করতে হয়, নতুন কিছু তৈরি করতে হয়, সেদিকেই বেশি জোর দিচ্ছে। তারা চায় শিশুরা যেন প্রশ্ন করতে শেখে, নিজেদের মতো করে ভাবতে শেখে এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হয়। আমার মনে হয়, যেকোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই এটা একটা যুগান্তকারী এবং খুব দরকারি পদক্ষেপ।
প্র: “জিরো ড্রপআউট” প্রোগ্রামটি কী এবং এটি শিক্ষার্থীদের কীভাবে সাহায্য করবে?
উ: দেখুন, আমি নিজে দেখেছি, অনেক সময় শুধু আর্থিক বা পারিবারিক সমস্যার কারণে অনেক প্রতিভাবান শিশু স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এটা যে কত কষ্টের, তা বলে বোঝানো যাবে না, কারণ এতে শুধু শিশুটিই তার সুযোগ হারায় না, দেশও অনেক সম্ভাবনা হারায়। থাইল্যান্ড সরকারও এই গুরুতর সমস্যাটা খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। তারা “জিরো ড্রপআউট” নামে একটা চমৎকার এবং খুবই মানবিক প্রোগ্রাম চালু করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, কোনো শিশুই যেন কোনো কারণে স্কুল থেকে ঝরে না পড়ে। আমার মনে হয়, এর মাধ্যমে সরকার সেই সব শিশুদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে যারা হয়তো পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না বা মাঝপথে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। সরকার হয়তো তাদের জন্য বিশেষ সাহায্য, যেমন – বৃত্তি, পরামর্শ বা অনুপ্রেরণামূলক কর্মসূচি দেবে, যাতে তারা স্কুলে ফিরে আসতে পারে এবং তাদের পড়ালেখা শেষ করতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য, কারণ প্রতিটি শিশুরই শিক্ষার অধিকার আছে এবং এটা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।






