পর্যটকদের জন্য থাইল্যান্ডের দ্বীপগুলো বরাবরই এক স্বপ্নীল গন্তব্য। সমুদ্রের নীল জল, সাদা বালির সৈকত, আর সবুজের হাতছানি – সবকিছু মিলে যেন এক অন্য জগত। আমিও আপনাদের মতোই সমুদ্র ভালোবাসেন এমন একজন, আর তাই আমার অসংখ্য থাই দ্বীপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, প্রতিটি দ্বীপের নিজস্ব এক আলাদা সৌন্দর্য ও অনুভূতি আছে। ফুকেট, ফি ফি, কো সামুই, ক্রাবি – এই নামগুলো শুনলেই মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে, তাই না?
কিন্তু এতগুলো চমৎকার অপশনের মধ্যে আপনার জন্য সেরা দ্বীপটি কোনটি হবে, তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন। ২০২৩-২০২৫ সালের ট্রাভেল ট্রেন্ডগুলো বলছে, এখন আর শুধু জনপ্রিয় স্পট নয়, বরং নিজের রুচি ও বাজেট অনুযায়ী সেরা অভিজ্ঞতা খুঁজছে ভ্রমণপিপাসুরা। কেউ শান্তি চায়, কেউ অ্যাডভেঞ্চার, আবার কেউ বা চায় সংস্কৃতি ও সমুদ্রের মিশেল। আপনিও যদি আমার মতো এমন কোনো দ্বীপে ছুটি কাটাতে চান যেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাও আছে, আবার প্রকৃতিও তার আপন মহিমায় উজ্জ্বল, তাহলে এই লেখাটি আপনার জন্যই। চলুন, আপনার স্বপ্নের থাই দ্বীপ খুঁজে বের করার সব গোপন টিপস আর ট্রেন্ডগুলো জেনে নিই, যা আপনার পরবর্তী থাইল্যান্ড ভ্রমণকে করে তুলবে অবিস্মরণীয়!
নিচে বিস্তারিতভাবে এই বিষয়ে আলোচনা করা যাক।
থাইল্যান্ডের দ্বীপভূমি: আপনার পছন্দের সৈকত ও সাগর

আপনারা যারা আমার মতো সাগর আর সৈকতের প্রেমে পড়েছেন, তারা জানেন থাইল্যান্ডের দ্বীপগুলো কতটা মায়াময় হতে পারে। কিন্তু এই এতগুলো দ্বীপের ভিড়ে কোনটা আপনার জন্য সেরা, সেটা বেছে নেওয়া যেন এক মিষ্টি সমস্যা!
ফুকেট, কো সামুই, ক্রাবি, ফি ফি – প্রতিটি দ্বীপই তার নিজস্ব সৌন্দর্যে উজ্জ্বল। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ফুকেট একদিকে যেমন জমজমাট আর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন, তেমনই কো সামুই তার শান্ত পরিবেশ আর বিলাসবহুল রিসোর্টের জন্য বিখ্যাত। ক্রাবি তার চুনাপাথরের পাহাড় আর অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি দিয়ে মুগ্ধ করে, আর ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর নাইটলাইফের জন্য আলাদা পরিচিতি লাভ করেছে। আপনি যদি পরিবারের সাথে আরামদায়ক ছুটি কাটাতে চান, অথবা বন্ধুদের সাথে হৈ-হুল্লোড় করে অ্যাডভেঞ্চার উপভোগ করতে চান, কিংবা ভালোবাসার মানুষের সাথে নির্জন প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে চান, থাইল্যান্ডে সবার জন্যই কিছু না কিছু আছে। ২০২৩-২০২৫ সালের ভ্রমণ ট্রেন্ডগুলো বলছে, এখন পর্যটকরা শুধু বিখ্যাত স্থান নয়, বরং নিজেদের পছন্দ, রুচি আর বাজেট অনুযায়ী সেরা অভিজ্ঞতা খুঁজছে। এই ট্রেন্ডকে মাথায় রেখে আমি চেষ্টা করেছি আপনাদের জন্য থাইল্যান্ডের সেরা দ্বীপগুলো এবং সেগুলোর বিশেষত্ব নিয়ে একটি বিস্তারিত গাইড তৈরি করতে, যাতে আপনার পরবর্তী থাইল্যান্ড ভ্রমণ হয় truly unforgettable!
কেন থাইল্যান্ডের দ্বীপগুলো এত জনপ্রিয়?
থাইল্যান্ডের দ্বীপগুলো বিশ্বজুড়ে এত জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। এর স্ফটিক স্বচ্ছ নীল জল, দুধের মতো সাদা বালির সৈকত, আর চারপাশের সবুজে ঘেরা প্রকৃতি যেকোনো ভ্রমণপিপাসুকে মুগ্ধ করতে যথেষ্ট। এছাড়া, থাইল্যান্ডের আতিথেয়তা, সুস্বাদু খাবার আর সাশ্রয়ী ভ্রমণ খরচ এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। আমার মনে আছে একবার কো সামুইতে আমি একটি ছোট স্থানীয় রেস্তোরাঁয় খেয়েছিলাম, যেখানে সামান্য কিছু টাকায় আমি জীবনের সেরা সী-ফুড কারি খেয়েছিলাম। সেই স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে!
এখানকার ডাইভিং, স্নরকেলিং, রক ক্লাইম্বিং, কায়াকিংয়ের মতো নানা ধরনের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস পর্যটকদের মন জয় করে নেয়। আধুনিক হোটেল-রিসোর্ট থেকে শুরু করে বাজেট-ফ্রেন্ডলি গেস্ট হাউস, সব ধরনের থাকার ব্যবস্থাও এখানে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, প্রতিটি দ্বীপের নিজস্ব এক সাংস্কৃতিক আবেদনও রয়েছে, যা স্থানীয় জীবনযাত্রার এক ঝলক দেখার সুযোগ করে দেয়। সব মিলিয়ে থাইল্যান্ডের দ্বীপগুলো যেন এক টুকরো স্বর্গ, যেখানে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সাথে মিশে আছে আধুনিক বিনোদনের সব ব্যবস্থা।
আপনার জন্য সেরা দ্বীপটি কিভাবে বাছবেন?
থাইল্যান্ডে এতগুলো দারুণ দ্বীপ আছে যে, সেরাটা বেছে নেওয়াটা একটু কঠিন হতে পারে। আমার পরামর্শ হলো, প্রথমে নিজের পছন্দ আর অগ্রাধিকারগুলো ঠিক করে নিন। আপনি কি নির্জনতা চান নাকি জমজমাট পরিবেশ?
বিলাসবহুল ছুটি নাকি বাজেট-ফ্রেন্ডলি অ্যাডভেঞ্চার? শুধু রিল্যাক্স করতে চান নাকি অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে অংশ নিতে চান? যেমন, আপনি যদি ভিড় এড়িয়ে শান্তিতে সময় কাটাতে চান, তবে কোহ কুড (Koh Kood) বা কোহ লান্তা (Koh Lanta) আপনার জন্য ভালো হবে। অন্যদিকে, যদি আপনি পার্টি, কেনাকাটা আর রাতের জীবন পছন্দ করেন, তাহলে ফুকেট বা ফি ফি আইল্যান্ডস আপনার জন্য সেরা। প্রতিটি দ্বীপেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। ফুকেটে পাবেন সব ধরনের আধুনিক সুবিধা, বিলাসবহুল হোটেল, শপিং মল আর জমজমাট নাইটলাইফ। ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ তার অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মায়া বে আর ভাইকিং কেভের জন্য পরিচিত। কো সামুই তার স্পা, যোগা রিট্রিট আর পরিবার নিয়ে ঘোরার জন্য আদর্শ। ক্রাবি তার চুনাপাথরের পাহাড়, কায়াকিং আর রক ক্লাইম্বিংয়ের জন্য জনপ্রিয়। তাই, আপনার ভ্রমণের উদ্দেশ্য কী, তা পরিষ্কার হলে সঠিক দ্বীপ বেছে নেওয়াটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
শান্তির খোঁজে যারা: কো সামুই, কো ফাংগান ও কো তাও
আপনি যদি কোলাহল থেকে দূরে, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে কিছু শান্ত সময় কাটাতে চান, তাহলে থাইল্যান্ডের পূর্ব উপকূলের এই দ্বীপগুলো আপনার জন্য সেরা গন্তব্য। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কো সামুইতে আমি প্রথমবার যখন পা রেখেছিলাম, তখনই মনটা শান্তিতে ভরে গিয়েছিল। এর নরম বালির সৈকত, নারকেল গাছের সারি আর ফিরোজা রঙের জল মনকে এক অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। এই দ্বীপগুলো পরিবার নিয়ে বা হানিমুনে যাওয়ার জন্য দারুণ, কারণ এখানে বিলাসবহুল রিসোর্ট থেকে শুরু করে শান্ত সমুদ্র সৈকত সবকিছুরই সুন্দর একটা মিশ্রণ আছে। এখানে স্পা, যোগা ক্লাস আর মেডিটেশনের ব্যবস্থা খুব জনপ্রিয়, যা শহুরে জীবনের ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে। কোহ কুড দ্বীপ, যা অনেকের কাছে এখনো অজানা, সেটিও নির্জনতার জন্য একটি আদর্শ স্থান। এই ধরনের দ্বীপগুলোতে পর্যটকের ভিড় তুলনামূলকভাবে কম থাকায় আপনি নিজের মতো করে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
কো সামুই: বিলাসবহুল শান্তিনিবাস
কো সামুই থাইল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ, এবং এটি তার বিলাসবহুল রিসোর্ট, স্পা এবং শান্ত সৈকতের জন্য পরিচিত। আমার মনে আছে, কো সামুইতে একবার একটি “ইনফিনিটি পুল”-এর পাশে বসে সূর্যাস্ত দেখেছিলাম, সেই দৃশ্য এতটাই মুগ্ধ করার মতো ছিল যে মনে হয়েছিল যেন ছবি আঁকা হয়েছে!
এখানকার চাওয়াং (Chaweng) এবং লামাই (Lamai) বিচ বেশ জনপ্রিয়, তবে আপনি যদি আরও নিরিবিলি জায়গা চান, তাহলে বফুট (Bophut) বা ম্যা নাম (Maenam) বিচে যেতে পারেন। কো সামুইতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের রেস্তোরাঁ, ক্যাফে এবং বুটিক শপও আছে, যা আপনার ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক করে তুলবে। বিশেষ করে যারা পরিবার নিয়ে ঘুরতে যান, তাদের জন্য কো সামুই খুবই উপযুক্ত, কারণ এখানে বাচ্চাদের জন্য অনেক বিনোদনের ব্যবস্থা আছে। আমি নিজেও দেখেছি অনেক পরিবারকে এখানে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে ছুটি কাটাতে। এখানকার স্থানীয় জীবনযাত্রা এবং মন্দিরগুলোও দর্শনীয়, যা থাই সংস্কৃতির এক ঝলক দেখায়।
কোহ ফাংগান ও কো তাও: নির্জনতার অন্য রূপ
কোহ ফাংগান এবং কো তাও, কো সামুইয়ের খুব কাছে হলেও এদের নিজস্ব এক আলাদা চরিত্র আছে। কোহ ফাংগান “ফুল মুন পার্টি”-র জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও, দ্বীপের অন্যান্য অংশগুলো কিন্তু দারুণ শান্ত আর নির্জন। আমার বন্ধু রফিক একবার কোহ ফাংগানের উত্তর দিকে একটি শান্ত বাংলোতে থেকে এসেছিল, যেখানে সে পুরো সপ্তাহ শুধু বই পড়েছে আর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সময় কাটিয়েছে – তার ভাষায়, “যেন এক অন্য জগতে ছিলাম!” আর কোহ তাও!
এটা ডাইভিং আর স্নরকেলিং প্রেমীদের জন্য স্বর্গ। এখানকার সামুদ্রিক জীবন এতটাই সমৃদ্ধ যে, জলের নিচে গেলেই মনে হবে যেন এক জাদুর রাজ্যে চলে এসেছেন। সাশ্রয়ী মূল্যে ডাইভিং কোর্স করার জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা জায়গা। যারা ভিড় এড়িয়ে শান্তিতে নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য এই দুটি দ্বীপ দারুণ এক অভিজ্ঞতা দিতে পারে। এখানে পাবেন ছোট ছোট শান্ত সৈকত, স্থানীয় ক্যাফে আর নিরিবিলি পরিবেশ, যা আপনার মনকে সতেজ করে তুলবে।
অ্যাডভেঞ্চারের নেশা: ফুকেট এবং ক্রাবির রোমাঞ্চকর হাতছানি
আপনি যদি অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন, পাহাড়, সমুদ্র আর গভীর জঙ্গলের রোমাঞ্চ আপনাকে টানে, তাহলে ফুকেট আর ক্রাবি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার বহু থাই ভ্রমণ অভিজ্ঞতার মধ্যে ফুকেট আর ক্রাবিতে কাটানো দিনগুলো সবসময়ই আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল থাকে। ফুকেটের পাটং বিচ তার জমজমাট পরিবেশ আর নাইটলাইফের জন্য বিখ্যাত হলেও, এই দ্বীপের আনাচে-কানাচে রয়েছে আরও অনেক লুকানো রত্ন। অন্যদিকে, ক্রাবি তার চুনাপাথরের পাহাড় আর প্রকৃতির বুনো সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত, যা রক ক্লাইম্বারদের কাছে এক স্বপ্নের গন্তব্য। এই দুটি জায়গাতেই আপনি ওয়াটার স্পোর্টস থেকে শুরু করে হাইকিং, কায়াকিং, স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং – সবকিছুরই সুযোগ পাবেন। যারা একটু বেশি উত্তেজনা আর চ্যালেঞ্জ পছন্দ করেন, তাদের জন্য ফুকেট আর ক্রাবি দারুণ এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা দেবে।
ফুকেট: থাইল্যান্ডের বহুমুখী গন্তব্য
ফুকেট থাইল্যান্ডের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় দ্বীপ। এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, শপিং মল, এবং জমজমাট নাইটলাইফ সবকিছুই একসাথে পাওয়া যায়। আমার মনে আছে, একবার ফুকেটে এসে পাটং বিচে বন্ধুদের সাথে সারারাত পার্টি করেছিলাম, সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারি না!
তবে ফুকেট শুধু পার্টির জন্য নয়, এখানে বিগ বুদ্ধ, পুরনো ফুকেট টাউন, এবং সুন্দর সুন্দর মন্দিরগুলোও দেখার মতো। এছাড়াও, ফুকেট থেকে আপনি ফি ফি আইল্যান্ডস, জেমস বন্ড আইল্যান্ড এবং সিমিলান আইল্যান্ডসের মতো আকর্ষণীয় দ্বীপগুলোতে ডে ট্রিপে যেতে পারেন। ডাইভিং এবং স্নরকেলিংয়ের জন্যও ফুকেট একটি অসাধারণ জায়গা। এখানে সব ধরনের বাজেটের পর্যটকদের জন্যই থাকার ব্যবস্থা এবং খাবারের দোকান রয়েছে। যারা অ্যাডভেঞ্চার এবং আধুনিক জীবনের মিশ্রণ পছন্দ করেন, তাদের জন্য ফুকেট একটি আদর্শ গন্তব্য।
ক্রাবি: চুনাপাথরের রাজত্ব ও কায়াকিংয়ের স্বর্গ
ক্রাবি, তার অত্যাশ্চর্য চুনাপাথরের চূড়া, ম্যানগ্রোভ বন, এবং লুকানো লেগুনগুলির জন্য বিখ্যাত। আমার এক বন্ধু, যে কিনা একজন অভিজ্ঞ রক ক্লাইম্বার, সে ক্রাবির রেইলি বিচে রক ক্লাইম্বিং করতে গিয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে সে আর কোথাও যেতেই চায়নি!
ক্রাবিতে আপনি লংটেইল বোটে করে চার-দ্বীপ ট্যুরে যেতে পারেন, যেখানে আপনি প্রানং কেভ, চিকেন আইল্যান্ড, কো পোডা এবং তুপ আইল্যান্ড ঘুরে আসতে পারবেন। রেইলি বিচ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এবং এখানে সূর্যাস্তের দৃশ্য এতটাই মনোমুগ্ধকর যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কায়াকিংয়ের জন্যও ক্রাবি দারুণ এক জায়গা, বিশেষ করে থালান বে (Thalane Bay) যেখানে আপনি ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর দিয়ে কায়াকিং করতে করতে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। ক্রাবিতে হালাল খাবারের ব্যবস্থাও বেশ ভালো, যা মুসলিম পর্যটকদের জন্য একটি বাড়তি সুবিধা। যারা প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে অ্যাডভেঞ্চার উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য ক্রাবি একটি অসাধারণ বিকল্প।
ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীবন্ত নাইটলাইফ
ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্ফটিক স্বচ্ছ নীল জলের ছবি, যেখানে ভেসে বেড়ায় ছোট ছোট থাই বোট আর চারপাশে সবুজে মোড়া পাহাড়। এই দ্বীপপুঞ্জ তার অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর এক অন্যরকম নাইটলাইফের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। আমার অনেক বন্ধু যারা প্রথমবার থাইল্যান্ডে এসেছে, তাদের বেশিরভাগই ফি ফি আইল্যান্ডসকে তাদের পছন্দের তালিকায় সবার উপরে রাখে, এবং আমি নিজে গিয়ে দেখেছি কেন এটি এত জনপ্রিয়!
মায়া বে, যেখানে বিখ্যাত “দ্য বিচ” সিনেমার শুটিং হয়েছিল, সেটি তার মোহনীয় সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। ফি ফি শুধুমাত্র দিনের বেলার সৌন্দর্যের জন্য নয়, রাতের বেলাও এটি এক অন্যরকম রূপ ধারণ করে, যেখানে পর্যটকরা বিচ পার্টি আর ফায়ার শো উপভোগ করতে পারে।
মায়া বে’র জাদু ও এর আশেপাশের আকর্ষণ
মায়া বে, ফি ফি লে (Phi Phi Leh) দ্বীপে অবস্থিত, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। এর চারপাশে উঁচু চুনাপাথরের পাহাড় আর মাঝখানে শান্ত নীল জল – সত্যিই এক অসাধারণ দৃশ্য!
কিছুদিন আগে মায়া বে’কে পর্যটকদের ভিড় থেকে বাঁচাতে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল, যাতে এখানকার বাস্তুতন্ত্র আবার সতেজ হতে পারে। এখন অবশ্য এটি আবার খোলা হয়েছে, তবে কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, যা এখানকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে। মায়া বে ছাড়াও, ফি ফি লে’তে আরও আছে ভাইকিং কেভ (Viking Cave), যেখানে প্রাচীন গুহাচিত্র দেখা যায়, এবং লোহ সামাহ বে (Loh Samah Bay) যেখানে স্নরকেলিং করার চমৎকার সুযোগ আছে। ফি ফি ডন (Phi Phi Don) হচ্ছে প্রধান দ্বীপ, যেখানে বেশিরভাগ হোটেল, রেস্তোরাঁ আর রাতের বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। আমি যখন প্রথমবার মায়া বে’তে গিয়েছিলাম, তখন মনে হয়েছিল যেন আমি কোনো পোস্টকার্ডের ছবিতে দাঁড়িয়ে আছি, এতটাই সুন্দর ছিল সেখানকার পরিবেশ।
ফি ফি’র জমজমাট রাতের জীবন
ফি ফি আইল্যান্ডস শুধু দিনের বেলার সৌন্দর্যের জন্যই নয়, রাতের বেলার জমজমাট পরিবেশের জন্যও সমানভাবে জনপ্রিয়। ফি ফি ডনের টনসাই (Tonsai) এলাকায় অসংখ্য বার, রেস্তোরাঁ আর নাইট ক্লাব আছে, যেখানে সারারাত চলে ফায়ার শো আর গান-বাজনার আসর। আমার মনে আছে, একবার বিচ পার্টিতে গিয়ে আমি সারারাত ধরে স্থানীয়দের সাথে নেচেছিলাম, যা ছিল আমার থাইল্যান্ড ভ্রমণের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা!
এখানকার স্থানীয় খাবারও খুব সুস্বাদু, বিশেষ করে ফ্রেশ সী-ফুড BBQ, যা রাতের বেলা বিচ রেস্তোরাঁগুলোতে পাওয়া যায়। যারা দিনভর অ্যাডভেঞ্চার আর রাতে জমজমাট পার্টি উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য ফি ফি আইল্যান্ডস একটি অসাধারণ গন্তব্য। তবে, শান্ত পরিবেশ যারা পছন্দ করেন, তারা দ্বীপের একটু ভেতরের দিকে বা অন্য কোনো ছোট দ্বীপে থাকার পরিকল্পনা করতে পারেন।
বাজেট-বান্ধব স্বর্গ: কম খরচে থাই দ্বীপের জাদু

থাইল্যান্ডের দ্বীপগুলো মানেই যে সব বিলাসবহুল আর ব্যয়বহুল হবে, এমনটা কিন্তু একদমই নয়! আমার অসংখ্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এখানে এমন অনেক দ্বীপ আছে যেখানে আপনি খুবই সাশ্রয়ী মূল্যে চমৎকার একটি ছুটি কাটাতে পারবেন। যারা বাজেট নিয়ে একটু চিন্তিত, কিন্তু থাইল্যান্ডের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এই বিভাগটি খুবই উপকারী হবে। কম খরচেও কিভাবে থাইল্যান্ডের দ্বীপের জাদু উপভোগ করা যায়, তার কিছু গোপন টিপস আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। সব সময় দামি হোটেল বা রেস্তোরাঁ খোঁজাটা বোকামি, কারণ অনেক সময় স্থানীয় ছোট দোকান বা গেস্ট হাউসগুলো আপনাকে সেরা অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
কোহ লান্তা: পরিবারের সাথে সাশ্রয়ী ছুটি
কোহ লান্তা একটি তুলনামূলকভাবে শান্ত এবং বাজেট-বান্ধব দ্বীপ, যা পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য আদর্শ। ফুকেটের মতো জমজমাট না হলেও, এখানকার সৈকতগুলো খুবই সুন্দর আর শান্ত। আমার এক বন্ধু সপরিবারে কোহ লান্তা ঘুরে এসেছিল এবং সে আমাকে বলেছিল যে, সেখানকার স্থানীয় গেস্ট হাউসগুলো এতটাই আরামদায়ক আর সস্তা ছিল যে তারা ভাবতেও পারেনি!
এখানে স্থানীয় থাই খাবারের দোকানগুলোতেও খুব কম খরচে দারুণ সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়। কোহ লান্তা থেকে আপনি বিভিন্ন ডে ট্রিপে যেতে পারেন, যেমন চার-দ্বীপ ট্যুর, যেখানে আপনি কোহ মুক (Koh Mook), কোহ কুড (Koh Kood), কোহ কফি (Koh Kopi) এর মতো সুন্দর দ্বীপগুলো ঘুরে আসতে পারবেন। এছাড়াও, এখানে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট কায়াকিং এবং স্থানীয় গ্রামগুলোতে ঘুরে আসার সুযোগও আছে, যা আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলবে।
কোহ চ্যাং: ব্যাংককের কাছে এক সবুজ রত্ন
কোহ চ্যাং থাইল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ এবং এটি ব্যাংকক থেকে খুব বেশি দূরে নয়, তাই যারা ব্যাংকক থেকে স্বল্প সময়ের জন্য দ্বীপ ভ্রমণে যেতে চান, তাদের জন্য এটি একটি দারুণ বিকল্প। কোহ চ্যাং তার ঘন জঙ্গল, জলপ্রপাত, এবং সুন্দর সৈকতের জন্য পরিচিত। এখানকার পরিবেশ ফুকেটের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত এবং প্রকৃতির কাছাকাছি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কোহ চ্যাংয়ের জলপ্রপাতগুলো এতটাই সুন্দর যে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে সেগুলোর শীতল জলে পা ভিজিয়ে রেখেছিলাম!
এখানে বিভিন্ন ধরনের বাজেট-ফ্রেন্ডলি রিসোর্ট এবং বাংলো পাওয়া যায়। এছাড়াও, স্কুটার ভাড়া করে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখতে পারেন, যা এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার এক অসাধারণ উপায়। এখানেও আপনি ডাইভিং, স্নরকেলিং এবং ট্রেকিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চার উপভোগ করতে পারবেন, যা আপনার বাজেটকে খুব বেশি চাপ দেবে না।
আপনার সেরা ভ্রমণের সময়: কখন যাবেন, কী প্রস্তুতি নেবেন
থাইল্যান্ডের দ্বীপগুলোতে ভ্রমণের সেরা সময় বেছে নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আবহাওয়া আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে অনেকটাই প্রভাবিত করতে পারে। আমার এতো বছরের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি যে, সঠিক সময়ে সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে গেলেই ভ্রমণের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায়। থাইল্যান্ডের আবহাওয়া স্থানভেদে এবং ঋতুভেদে কিছুটা ভিন্ন হয়, তাই আপনার পছন্দের দ্বীপের জন্য সেরা সময়টা জেনে নেওয়া উচিত। সাধারণত, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত থাইল্যান্ড ভ্রমণের জন্য সেরা সময় হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক ও আরামদায়ক থাকে। এই সময়ে তাপমাত্রা সহনীয় থাকে এবং বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও খুব কম থাকে, যা সমুদ্র সৈকতে আরাম করার জন্য বা বিভিন্ন আউটডোর কার্যকলাপে অংশ নেওয়ার জন্য আদর্শ।
আবহাওয়া ও সেরা ঋতু
থাইল্যান্ডে মূলত তিনটি ঋতু দেখা যায়: শুষ্ক ও শীতল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), গরম (মার্চ-মে) এবং বর্ষাকাল (মে-অক্টোবর)।
* শীতল ও শুষ্ক ঋতু (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি): এটি থাইল্যান্ড ভ্রমণের পিক সিজন। এই সময় আবহাওয়া খুবই মনোরম থাকে, তাপমাত্রা ২৩°C থেকে ৩১°C এর মধ্যে থাকে এবং বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম। ফুকেট, ক্রাবি, কো সামুই, ফি ফি সহ সব দ্বীপেই এই সময়টা ঘোরার জন্য সেরা।
* গরম ঋতু (মার্চ-মে): এই সময় তাপমাত্রা বেশ বেড়ে যায়, ৩০°C থেকে ৪০°C পর্যন্ত হতে পারে। তবে, উপকূলীয় অঞ্চলগুলো সমুদ্রের হাওয়ায় কিছুটা শীতল থাকে। যারা রোদ পোহাতে বা ওয়াটার স্পোর্টস উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এই সময়টাও মন্দ নয়, বিশেষ করে মার্চের দিকে।
* বর্ষাকাল (মে-অক্টোবর): এই সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়, বিশেষ করে বিকেলের দিকে। তবে, বৃষ্টি হলেও প্রকৃতি সবুজে ভরে ওঠে এবং পর্যটকদের ভিড় কম থাকায় খরচও কম হয়। কিছু দ্বীপে, যেমন কোহ সামুই, কোহ ফাংগান, কোহ তাও-তে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত আবহাওয়া বেশ ভালো থাকে, এমনকি বর্ষাকালেও মাঝে মাঝে ভালো দিন পাওয়া যায়। কোহ কুডের ক্ষেত্রে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আদর্শ সময়।
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও টিপস
যেকোনো ভ্রমণ সফল করার জন্য সঠিক প্রস্তুতি অত্যাবশ্যক। থাইল্যান্ড ভ্রমণের আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা উচিত:
* ভিসা ও পাসপোর্ট: আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ৬ মাস থাকতে হবে এবং থাইল্যান্ডের ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করুন।
* ফ্লাইট ও হোটেল বুকিং: পিক সিজনে ভ্রমণ করলে ফ্লাইট এবং হোটেল আগে থেকেই বুক করে রাখা ভালো, কারণ শেষ মুহূর্তে দাম বেড়ে যেতে পারে বা পছন্দসই জায়গা নাও পেতে পারেন।
* প্যাকিং: হালকা পোশাক, সাঁতারের পোশাক, সানস্ক্রিন, সানগ্লাস, টুপি এবং আরামদায়ক স্যান্ডেল নিতে ভুলবেন না। বর্ষাকালে গেলে ছাতা বা রেইনকোট নিতে পারেন।
* স্থানীয় পরিবহন: থাইল্যান্ডে স্থানীয় পরিবহনের জন্য টুক টুক, ট্যাক্সি, বাস এবং ফেরি বেশ সহজলভ্য। বিভিন্ন দ্বীপের মধ্যে যাতায়াতের জন্য ফেরি বা স্পিডবোট জনপ্রিয়।
* অর্থ ও বাজেট: থাই বাথ হলো থাইল্যান্ডের মুদ্রা। ক্রেডিট কার্ড সব বড় দোকানে চলে, তবে ছোট দোকান বা স্থানীয় বাজারে ক্যাশ ব্যবহার করা ভালো। বাজেট অনুযায়ী খরচ করার জন্য স্থানীয় খাবারের দোকানগুলো বেছে নিতে পারেন।
* স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা: ব্যক্তিগত ঔষধপত্র সাথে রাখুন। স্থানীয় নিয়মকানুন মেনে চলুন এবং নিজের জিনিসপত্রের প্রতি সতর্ক থাকুন।
আশেপাশের লুকানো রত্ন: কম পরিচিত কিন্তু অসাধারণ দ্বীপগুলো
থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় দ্বীপগুলো যেমন ফুকেট বা ফি ফি’র বাইরেও কিছু লুকানো রত্ন আছে, যা এখনো পর্যটকদের ভিড় থেকে অনেকটা মুক্ত। যারা নির্জনতা ভালোবাসেন এবং থাইল্যান্ডের অন্যরকম সৌন্দর্য আবিষ্কার করতে চান, তাদের জন্য এই দ্বীপগুলো দারুণ এক অভিজ্ঞতা দিতে পারে। আমার ব্যক্তিগতভাবে এমন কম পরিচিত জায়গায় ঘুরতে যেতে খুবই ভালো লাগে, কারণ সেখানে স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে আরও গভীরভাবে মিশে যাওয়ার সুযোগ থাকে। এই দ্বীপগুলো আপনাকে প্রকৃতির আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং দেবে এক অবিস্মরণীয় শান্তি ও প্রশান্তি।
কোহ লি পে: আন্দামান সাগরের ছোট মণিমুক্তা
কোহ লি পে, আন্দামান সাগরের একটি ছোট কিন্তু অপরূপ সুন্দর দ্বীপ। এটি তার ফিরোজা রঙের জল, সাদা বালির সৈকত এবং স্ফটিক স্বচ্ছ জলের জন্য পরিচিত। আমার বন্ধু রিমা একবার কোহ লি পে থেকে ফিরে এসে বলেছিল, যেন সে জীবনে প্রথমবার এমন নীল জল দেখেছে, এতটাই পরিষ্কার ছিল সেখানকার জল!
ডাইভিং এবং স্নরকেলিংয়ের জন্য এই দ্বীপটি অসাধারণ, কারণ এখানকার সামুদ্রিক জীবন খুবই বৈচিত্র্যময়। এখানে তিনটি প্রধান সৈকত আছে – সানরাইজ বিচ, সানসেট বিচ এবং পাতায়া বিচ। কোহ লি পে তুলনামূলকভাবে ছোট দ্বীপ হওয়ায় এটি হেঁটে বা ভাড়া করা স্কুটারে সহজেই ঘুরে দেখা যায়। যারা ভিড় এড়িয়ে একটি রোমান্টিক বা শান্ত ছুটি কাটাতে চান, তাদের জন্য কোহ লি পে একটি স্বপ্নের গন্তব্য।
কোহ কুড: থাইল্যান্ডের শেষ অক্ষত দ্বীপ
কোহ কুড থাইল্যান্ডের একটি অপ্রচলিত দ্বীপ, যা ২০১৪ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ দ্বারা ‘থাইল্যান্ডের শেষ অক্ষত দ্বীপ’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিল। আমার মনে আছে, একবার আমি কোহ কুডে গিয়ে একটি ছোট্ট রিসোর্টে থেকেছিলাম, যেখানে বিদ্যুতও সীমিত সময়ের জন্য ছিল, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই আমাকে প্রকৃতির সাথে আরও কাছে এনেছিল। এটি তার ঘন জঙ্গল, জলপ্রপাত এবং নির্জন সৈকতের জন্য পরিচিত। এখানে গাড়ির চলাচল খুবই কম, তাই স্কুটার ভাড়া করে বা হেঁটে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এখানকার জলপ্রপাতগুলোর নিচে সাঁতার কাটা যায় এবং প্রকৃতির মাঝে হাইকিং করার সুযোগও আছে। কোহ কুড এমন একটি জায়গা, যেখানে আপনি সত্যিই প্রকৃতির কোলে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারবেন এবং শহুরে জীবনের ব্যস্ততা ভুলে যেতে পারবেন। এখানে স্থানীয় জেলেদের গ্রাম এবং তাজা সী-ফুডের রেস্তোরাঁগুলোও উপভোগ করার মতো।
| দ্বীপের নাম | বিশেষত্ব | উপযোগী পর্যটকের ধরন | সেরা ভ্রমণের সময় |
|---|---|---|---|
| ফুকেট | জমজমাট নাইটলাইফ, আধুনিক সুবিধা, শপিং, ডে ট্রিপের সুযোগ | পরিবার, বন্ধু দল, যারা সব ধরনের বিনোদন চান | নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি |
| কো সামুই | বিলাসবহুল রিসোর্ট, স্পা, শান্ত সৈকত, পরিবার-বান্ধব | পরিবার, দম্পতি, যারা রিল্যাক্সিং ছুটি চান | জানুয়ারি থেকে মার্চ |
| ক্রাবি | চুনাপাথরের পাহাড়, রক ক্লাইম্বিং, কায়াকিং, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য | অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী, প্রকৃতি প্রেমিক | ডিসেম্বর ও জানুয়ারি |
| ফি ফি আইল্যান্ডস | অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মায়া বে, জমজমাট বিচ পার্টি | তরুণ পর্যটক, দম্পতি, পার্টি লাভার্স | ডিসেম্বর ও জানুয়ারি |
| কোহ লান্তা | শান্ত ও সাশ্রয়ী, পরিবার-বান্ধব, ডে ট্রিপের সুযোগ | বাজেট সচেতন পরিবার, যারা নির্জনতা চান | নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি |
| কোহ কুড | অক্ষত প্রকৃতি, নির্জন সৈকত, জলপ্রপাত, প্রকৃতি থেকে দূরে | প্রকৃতি প্রেমিক, যারা ভিড় এড়িয়ে শান্ত পরিবেশ চান | নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি |
글을মাচিয়ে
থাইল্যান্ডের এই দ্বীপগুলো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমার মন যেন বারবার ফিরে যাচ্ছ সেই স্ফটিক স্বচ্ছ জলের ধারে, যেখানে সময় থেমে গিয়েছিল। প্রতিটি দ্বীপের নিজস্ব এক গল্প আছে, এক অনবদ্য আকর্ষণ আছে। আশা করি, আমার এই দীর্ঘ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আপনাদেরকে নিজেদের জন্য সেরা থাই দ্বীপটি বেছে নিতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়, এটি নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা এবং নিজেকে আবিষ্কার করার এক দারুণ সুযোগ। আপনার থাইল্যান্ড ভ্রমণ যেন আপনার জীবনের সেরা স্মৃতিগুলোর একটি হয়, সেই শুভকামনা রইল!
নিজে গিয়ে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে ছেড়ে দেওয়ার যে আনন্দ, তার তুলনা হয় না। তাই আর দেরি না করে, নিজের পছন্দ আর বাজেট অনুযায়ী আপনার স্বপ্নের থাই দ্বীপের টিকিট কেটে ফেলুন!
জেনে রাখুন কিছু দরকারী তথ্য
১. ভ্রমণের সেরা সময়: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস থাইল্যান্ড ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক এবং মনোরম থাকে, যা সৈকতে আরাম করার জন্য বা আউটডোর কার্যকলাপের জন্য আদর্শ।
২. আগে থেকে বুকিং: পিক সিজনে ভ্রমণ করলে বিমান টিকিট এবং হোটেল আগে থেকেই বুক করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এতে শেষ মুহূর্তের ঝামেলা এড়ানো যায় এবং ভালো অফারও পাওয়া যায়।
৩. প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র: হালকা পোশাক, সাঁতারের পোশাক, সানস্ক্রিন, সানগ্লাস এবং একটি টুপি সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। স্থানীয় বাজারে ক্যাশ টাকা ব্যবহার করতে সুবিধা হবে, তাই কিছু থাই বাথ (মুদ্রা) সঙ্গে রাখুন।
৪. স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান: থাইল্যান্ডের স্থানীয় সংস্কৃতি এবং রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন। মন্দির পরিদর্শনের সময় শালীন পোশাক পরুন এবং স্থানীয়দের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করুন।
৫. লুকানো রত্ন আবিষ্কার: ফুকেট বা ফি ফি-এর মতো জনপ্রিয় দ্বীপগুলোর বাইরে কোহ লি পে বা কোহ কুডের মতো কম পরিচিত দ্বীপগুলো ঘুরে দেখুন। সেখানে আপনি আরও শান্ত এবং প্রকৃতির কাছাকাছি একটি অভিজ্ঞতা পাবেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এক নজরে
থাইল্যান্ডের দ্বীপগুলো প্রতিটি ভ্রমণকারীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে – তা সে অ্যাডভেঞ্চার হোক, রোমান্স হোক, বা নিছকই প্রকৃতির মাঝে শান্তি খুঁজে নেওয়া। আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ, বাজেট এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্য অনুযায়ী সঠিক দ্বীপটি বেছে নেওয়া জরুরি। কোলাহলপূর্ণ ফুকেট থেকে শান্ত কোহ কুড পর্যন্ত, প্রতিটি দ্বীপেই নিজস্ব জাদু রয়েছে। তাই, ভ্রমণের আগে ভালো করে পরিকল্পনা করুন, স্থানীয় আবহাওয়া সম্পর্কে জেনে নিন এবং সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা করুন। মনে রাখবেন, থাইল্যান্ডে আপনি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই উপভোগ করবেন না, এর পাশাপাশি পাবেন অসাধারণ আতিথেয়তা এবং সুস্বাদু থাই খাবারের স্বাদ। আপনার থাই দ্বীপ ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত যেন হয় আনন্দময় এবং স্মৃতিময়!
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: থাইল্যান্ডে এতগুলো দারুণ দ্বীপ থাকতে, আমার জন্য সেরাটা খুঁজে বের করার গোপন মন্ত্রটা কী? প্রথমবারের মতো যারা যাচ্ছেন, তাদের জন্য বিশেষ কোনো টিপস আছে কি?
উ: আরে, কী যে বলেন! এই প্রশ্নটা আমিও প্রথমবার থাইল্যান্ডে যাওয়ার আগে নিজেকে হাজারবার করেছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ‘সেরা দ্বীপ’ বলে কিছু নেই, আছে আপনার রুচি আর পছন্দের সঙ্গে মানানসই একটা দ্বীপ। ধরুন, আপনি যদি আমার মতো আরাম আর আয়েশী সময় কাটাতে চান, সুন্দর রিসোর্টে থেকে পুলের ধারে বই পড়তে ভালোবাসেন, তাহলে কো সামুই বা ফুকেট আপনার জন্য দারুণ হবে। এখানে সব ধরনের আধুনিক সুবিধা আছে, ভালো ভালো রেস্টুরেন্ট, স্পা – সব মিলিয়ে এক রাজকীয় অনুভূতি। আর যদি একটু নিরিবিলি, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চান, কো লান্তা বা কো লি-এর মতো দ্বীপগুলো দেখতে পারেন। এসব জায়গায় ভিড়টা তুলনামূলক কম, আর পরিবেশটা একদম শান্ত। আমার তো কো লান্তায় গিয়ে মনে হয়েছিল যেন প্রকৃতির কোলে এক টুকরো শান্তির স্বর্গ খুঁজে পেয়েছি!
প্রথমবারের মতো যারা যাচ্ছেন, তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো, প্রথমে নিজের পছন্দটা বুঝে নিন – কী ধরনের ছুটি চান? অ্যাডভেঞ্চার নাকি রিল্যাক্সেশন? বাজেটটা কেমন?
এই কটা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেই আপনার স্বপ্নের দ্বীপ খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে।
প্র: ফুকেট, ফি ফি, কো সামুই, ক্রাবি – এই নামগুলো শুনলেই মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে! এই জনপ্রিয় দ্বীপগুলোর মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো কী, আর কোন ধরনের ভ্রমণকারীরা কোন দ্বীপে বেশি আনন্দ পাবে বলে আপনার মনে হয়?
উ: একদম ঠিক বলেছেন! এই নামগুলো যেন থাইল্যান্ডের দ্বীপ ভ্রমণের প্রতিশব্দ হয়ে গেছে। আমার অনেকবার এই দ্বীপগুলোতে যাওয়া হয়েছে, তাই এদের আসল চরিত্রটা আমি খুব ভালো বুঝি। ফুকেট হলো থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় এবং জমজমাট দ্বীপ। এখানে আপনি দারুণ নাইটলাইফ, শপিং, আর সব ধরনের ওয়াটার স্পোর্টসের সুবিধা পাবেন। যারা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করতে ভালোবাসেন বা পরিবারের সাথে একটা জমজমাট ছুটি চান, ফুকেটের জুড়ি নেই। আমার তো পাটনং বিচের উন্মাদনা ভীষণ ভালো লাগে!
অন্যদিকে, ফি ফি দ্বীপপুঞ্জ তাদের অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিশেষ করে মায়া বে-এর জন্য বিখ্যাত। যারা স্ফটিক স্বচ্ছ জলে স্নরকেলিং বা ডাইভিং করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য ফি ফি এক স্বপ্নের গন্তব্য। এখানে গেলে মনে হবে যেন কোনও পোস্টকার্ডের ছবি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কো সামুই হলো একটু আভিজাত্যপূর্ণ ও বিলাসবহুল দ্বীপ। যারা নির্ঝঞ্ঝাট ও আরামদায়ক ছুটি কাটাতে চান, ভালো মানের রিসোর্ট আর স্পা উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য সামুই একদম পারফেক্ট। আর ক্রাবি?
ক্রাবি হলো অ্যাডভেঞ্চার আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এখানে চুনাপাথরের বিশাল সব খাড়া পাহাড়, গুহা, আর রেইলয় বিচ-এর মতো দারুণ স্পট আছে যেখানে রক ক্লাইম্বিং-এর অভিজ্ঞতা নেওয়া যায়। যারা আমার মতো একটু অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, তাদের জন্য ক্রাবি এক দারুণ জায়গা।
প্র: আমার বাজেট একটু সীমিত, কিন্তু আমি চাই থাইল্যান্ডের দ্বীপে গিয়ে সত্যিকারের স্থানীয় সংস্কৃতি আর একটু অফবিট অভিজ্ঞতা নিতে। আমার মতো ভ্রমণপিপাসুদের জন্য থাইল্যান্ডের কোন দ্বীপগুলো সবচেয়ে ভালো হবে?
উ: বাজেট সীমিত বলে কি আর ভালো অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে না? একদম ভুল! থাইল্যান্ডে এমন অনেক দ্বীপ আছে যেখানে আপনি কম খরচেও দারুণ অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন, আর স্থানীয় সংস্কৃতিকে খুব কাছ থেকে উপভোগ করতে পারবেন। আমার নিজের অনেকবার বাজেট ট্রিপের অভিজ্ঞতা আছে, আর আমি আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি, কো চ্যাং বা কো লান্তা এক্ষেত্রে দারুণ বিকল্প। কো চ্যাং থাইল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ, কিন্তু ফুকেটের মতো অতটা বাণিজ্যিক হয়ে ওঠেনি। এখানে আপনি সবুজ পাহাড়, শান্ত সৈকত, আর ছোট ছোট গ্রাম পাবেন যেখানে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা দেখতে পাবেন। আমি যখন কো চ্যাং গিয়েছিলাম, তখন বাইক ভাড়া করে দ্বীপের ভেতরের দিকে ঘুরেছিলাম, ছোট ছোট স্থানীয় রেস্টুরেন্টে খেয়েছিলাম – একদম ভিন্ন এক অনুভূতি!
কো লান্তাও বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য খুব ভালো। এখানে আপনি তুলনামূলক সস্তায় গেস্ট হাউস বা বাংলো পাবেন, আর সৈকতে বসে সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখা বা স্থানীয়দের সাথে গল্প করার অভিজ্ঞতা একেবারেই অন্যরকম। আরেকটা অফবিট অপশন হলো কো ফায়াম। এটা একদমই ছোট আর কম পরিচিত একটা দ্বীপ, যেখানে এখনও পর্যটকদের ভিড় ততটা বাড়েনি। আপনি যদি সত্যিই নির্জনতা, প্রাকৃতিক পরিবেশ আর একদম স্থানীয় অভিজ্ঞতা পেতে চান, তাহলে কো ফায়াম আপনার মন জয় করবেই। মনে রাখবেন, এসব দ্বীপে গেলে স্থানীয় খাবারগুলো চেখে দেখতে ভুলবেন না – আপনার ভ্রমণ আরও রঙিন হয়ে উঠবে!






